Wednesday, November 9, 2011

মুম্বইয়ে প্রয়াত ভূপেন হাজরিকা

নিজস্ব প্রতিবেদন , anandabazar.com , 6th Nov 2011
আর পথ হাঁটবেন না ‘যাযাবর’। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে হেরেই গেলেন তিনি ভূপেন হাজরিকা। দীর্ঘ অসুস্থতার পর আজ মুম্বইয়ে প্রয়াত হলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮৬।
শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে গত ২৯ জুন আন্ধেরির কোকিলাবেন ধীরুভাই অম্বানী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ভূপেনবাবু। সে দিন থেকে হাসপাতালই ছিল তাঁর ঠিকানা। ৮ সেপ্টেম্বর জন্মদিনের কেক কেটেছিলেন আইসিইউয়েই। কিন্তু অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে শরীর আরও খারাপ হতে থাকে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন, চলছিল ডায়ালিসিসও। গত দু’দিন কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে ছিলেন। আজ বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ চিকিৎসকদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। অসমের সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রণতি ফুকন আগামিকাল মরদেহ আনতে মুম্বই রওনা হচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে ভূপেন হাজরিকা মানেই ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’ কিংবা ‘দোলা’র মতো কালজয়ী গান। কিন্তু জীবনের গণ্ডিটা তাঁর ছড়ানো আরও অনেক দূর। তিনি কবি-গায়ক-সঙ্গীত পরিচালক, আবার চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতাও বটে। অসম তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের মাটির গন্ধ কখনও ফিল্ম, কখনও গান হয়ে গোটা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর হাত ধরে। এ হেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটির উদ্দেশে আজ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে জঙ্গি আলফা নেতা পরেশ বরুয়া।
১৯২৬ সালে অসমের শদিয়ার এক শিক্ষক পরিবারে ভূপেনবাবুর জন্ম। নিজেই বলতেন, মায়ের মুখের ঘুমপাড়ানি গানই তাঁর গানের প্রথম পাঠ। জ্যোতিপ্রসাদ অগ্রবাল, বিষ্ণু রাভার মতো শিল্পী, কবি, পরিচালকদের সান্নিধ্য পান কিশোর বয়সেই। ১৯৩৯ সালে অসমীয় ভাষায় দ্বিতীয় ছবি ‘ইন্দ্রমালতী’তে মাত্র ১৩ বছর বয়সে গায়ক-অভিনেতার ভূমিকায় তাঁর আবির্ভাব। গানটা ছিল ‘বিশ্ব নিজয় নজোয়ান’। পড়াশোনাও চলছিল সমান তালে। ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে আইএ পাশ করে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এর পর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণজ্ঞাপনে পিএচডি। পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও বিকাশ নিয়ে গবেষণার জন্য শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লি’ল ফেলোশিপ’। আমেরিকাতেই আলাপ হয় পল রোবসনের সঙ্গে। রোবসনের গাওয়া ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ অবলম্বনে ভূপেনবাবু গান বাঁধেন ‘বিস্তীর্ণ পাররে’ (বাংলায় ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’)। হ্যারি বেলাফন্টের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতা ছিল তাঁর। এর পর কখনও ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের হয়ে দুই বাংলার রক্ত গরম করা গণসঙ্গীত, কখনও মুম্বইয়ে সঙ্গীত পরিচালনা। গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গী সলিল চৌধুরী, বলরাজ সাহনীদের হাত ধরেই প্রথম মুম্বই পাড়ি।
১৯৭৬ সালে ‘চামেলি মেমসাব’-এর জন্য পান প্রথম জাতীয় পুরস্কার। সারা জীবন অজস্র বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া ছবিতে কাজ করেছেন ভূপেনবাবু। তাঁর কণ্ঠ-সুরে সমৃদ্ধ বাংলা ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘জোনাকির আলো’, ‘কড়ি ও কোমল’, ‘অসমাপ্ত’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘বেচারা’, ‘দুই, ‘দম্পতি’, ‘মাহুত বন্ধুরে’ ইত্যাদি। হিন্দি ছবি কল্পনা লাজমির ‘রুদালি’, ‘এক পল’, ‘দরমিয়াঁ’, ‘দমন’, ‘কিঁউ’। এ ছাড়া সাই পরাঞ্জপের ‘পাপিহা’ এবং ‘সাজ’, মকবুল ফিদা হুসেনের ‘গজগামিনী’। তাঁর নিজের পরিচালিত তিনটি অসমিয়া ছবি ‘শকুন্তলা’, ‘প্রতিধ্বনি’ এবং ‘লটিঘটি’ রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পায়। ১৯৭৭ সালে পান পদ্মশ্রী, ১৯৯২-এ দাদাসাহেব ফালকে, ২০০১-এ পদ্মভূষণ। সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান ২০০৯-এ। ২০০৩ সালে প্রসার ভারতীর সদস্য হন। শেষ গান চলতি বছরেই ‘গাঁধী টু হিটলার’ ছবিতে ‘বৈষ্ণব জনতো’।
১৯৬৭ থেকে ’৭২ পর্যন্ত অসম বিধানসভার নির্দল বিধায়ক ছিলেন ভূপেনবাবু। তবে ২০০৪-এ বিজেপির হয়ে লোকসভা ভোটে হারের পর রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। অবশ্য তাতে জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। অসুস্থ হওয়ার সময় থেকেই প্রার্থনায় বসেছিল গোটা অসম। আর আজ মৃত্যুর খবর পেয়ে গুয়াহাটিতে তাঁর মূর্তির পাদদেশে ভিড় করেন ভক্তরা। সোমবার মরদেহ আসার পর তা দু’দিন রাখা থাকবে জাজেস ফিল্ডে। অসুস্থ থাকায় কানাডা থেকে আসতে পারছেন না প্রাক্তন স্ত্রী প্রিয়ম্বদা পটেল। ছেলে তেজ হাজরিকার আসাও নিশ্চিত নয়।
তবে ‘যাযাবর’ তো একা নন। গানে গানে গল্প বেঁধে এলেন সারা জীবন। সেই গল্পগুলো দিয়েই এ বার তাঁকে ঘিরে রাখবে গানপাগলের দল!