Thursday, November 17, 2011

পথে নামলেন 'যাযাবর'

By অমিতাভ ভট্টশালী , বিবিসি বাংলা, কলকাতা
রহ্মপুত্রের আরেক নাম বুঢ়া লুইত। ঐ নদী দিয়ে জল বয়েই চলেছে, কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের চারণকবি বলে সারা পৃথিবীতে যাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই ভূপেন হাজারিকার জীবন থেমে গেছে৻
উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে ১৯২৬ সালে এক শিক্ষক পরিবারে জন্ম ভূপেন হাজারিকার৻ গুয়াহাটি, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেছেন৻ আমেরিকায় থাকার সময়েই তাঁর পরিচয় কিংবদন্তী শিল্পী পল রবসনের সঙ্গে, যাঁর অনেক বিশ্ববিখ্যাত গানের ভারতীয় রূপান্তার করেছেন ভূপেন হাজারিকা৻
কিন্তু তার অনেক আগেই, ১৯৩৯ সালে অহমীয়া ভাষায় প্রযোজিত দ্বিতীয় ছায়াছবি ইন্দ্রমালতীর জন্য গান গেয়ে তাঁর সঙ্গীত জীবনের শুরু৻ তখন মি. হাজারিকার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর৻
অহমীয়া লোক সঙ্গীতের আধারে একের পর এক গান লিখেছেন, সুর করেছেন৻ যুক্ত হয়েছেন বামপন্থী গণনাট্য আন্দোলনে – যার ফলে ভূপেন হাজারিকার গানে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়ে এসেছে৻ প্রথমে অহমীয়া ভাষায় গাওয়া তাঁর গানগুলিতে, আর তারপরে যখন তিনি কলকাতায় এলেন, তখন তাঁর বাংলা গানগুলিতেও – যেমন, 'মানুষ মানুষের জন্য৻'
আসামে যতটা জনপ্রিয় মি. হাজারিকা, ততটাই তাঁর গানকে ভালবাসতেন বাংলাভাষীরাও৻ তাই বাংলাকে একের পর এক অসাধারন গান উপহার দিয়ে গেছেন তিনি, যার মধ্যে জনপ্রিয়গুলোর একটা – 'আমি এক যাযাবর।'
যাযাবর ছিলেন বলেই আসাম থেকে কলকাতা, সেখান থেকে মুম্বই পৌঁছেছিলেন ভূপেন হাজারিকা -- সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করতে৻ আর হিন্দীতেও গেয়েছেন অসংখ্য গান। হিন্দী গানের মধ্যে সাম্প্রতিক কালের বিখ্যাত রুদালি ছবির 'দিল হুম হুম করে' গানটা৻ এই গানটা নিয়ে মি. হাজারিকা মন্তব্য করেছিলেন, ঐ সুরটা অনেকটা তাঁর মায়ের গলায় শোনা একটা ছেলেভোলানো গানের সুরের মতো৻
রুদালি ছবির পরিচালিকা কল্পনা লজমির সঙ্গে তার অনেক আগে থেকেই অবশ্য বসবাস শুরু করেছিলেন তিনি৻ গানের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছায়াছবি প্রযোজনা আর পরিচালনাও করেছেন – অহমীয়া আর বাংলায়৻ গান লেখা, সুর করা, ছায়াছবি পরিচালনা করা – এসবের জন্য ভূপেন হাজারিকা পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। যার মধ্যে সেরা সঙ্গীত পরিচালকের সম্মান যেমন আছে, তেমনই আছে পদ্মশ্রী, দাদাসাহেব ফালকে সম্মান আর সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার।
সারা জীবন মি. হাজারিকা বামপন্থীদের ঘনিষ্ট বলে পরিচিত হয়ে এলেও ২০০৪ সালে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি তাঁকে লোকসভা ভোটে দাঁড় করায়৻ ঐ নির্বাচনে তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। ভোটে না জেতালেও ভূপেন হাজারিকার মৃত্যু সংবাদে গোটা ভারতের মতো আসামেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রাজ্য সরকার তাঁর মরদেহ মুম্বই থেকে গুয়াহাটি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে, যেখানে দু'দিন দেহ শায়িত থাকবে সাধারন মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ করে দিতে।
ভূপেন হাজারিকা জীবিত অবস্থাতেই যে প্রস্তর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে গুয়াহাটি শহরে, সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো আর সাধারন মানুষ ভীড় করছেন৻