Sunday, December 25, 2011

'গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা-------'


'গংগা আমার মা, পদ্মা আমার মা' গানটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে, দূর্গাপূজার সময়। ১৯৭১ মানেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, '৭১ মানেই আমাদের পরাধীনতার শৃংখল ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসা, ৭১ মানেই আমাদের বিজয়, '৭১ মানেই আমাদের বাংলাদেশ। ঠিক ঐ সময়টাতেই এই গানটির সৃষ্টি, কি গভীর গানের কথা, কি গভীর গানের সুর। চোখ ফেটে জল আসে, যখনই গানটি শুনি বুকের ভেতর কি যে এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়, সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায়না অথবা তা সব সময় করা উচিতও না। আমি গানপাগল মানুষ, গান ভালোবাসি, কয়েকটা গান সঞ্জীবনী মন্ত্রের মত কাজ করে, তার মধ্যে এই গানটি হচ্ছে একটি।
'৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম অনেক ছোট, প্রথম কয়েক মাস দেশের ভেতর নানা জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম আমরা। মাসের নাম মনে নেই, তবে আন্দাজ করি জুলাই মাসের দিকে আমরা ভারতে পৌঁছেছিলাম, আমার কাকার ভাড়া করা বাড়ীতেই উঠেছিলাম আমরা। ঐ সময়টা যে আলাদা এক সময় সেটা বুঝতে পারতাম। আমাদের কোন বায়নাক্কা ছিলোনা, যেমন রেখেছে বাবা মা, তেমনই থেকেছি। বিনোদনের কিছু ছিলনা, শুধু ঐ বাড়ির বারান্দায় বসে থেকে রাস্তার দোকান বা হোটেলগুলো থেকে মাইকে যে গান বাজতো, তাই শুনে কাটাতাম।
কখন দূর্গাপূজা চলে এসেছিল টেরও পাইনি, ঐ পাড়াতেই একটা পূজা হয়েছিল, কিনতু নিজেদের সব সময় বহিরাগত মনে হতো বলে ভীরু ভীরু পায়ে মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়াতাম প্যান্ডেলের সামনে। দিনরাত মাইকে গান বাজতো। অনেক গানের ভেতর ভুপেন হাজারিকার 'গংগা আমার মা, পদ্মা আমার মা' গানটা যখনই বেজে উঠতো, আমি আর আমার ছোট ভাই দৌড়ে বারান্দায় চলে যেতাম আর কান খাড়া করে গানটা শুনতাম। আমার ছোট ভাইটা তার কচি গলাতে কি সুন্দর করে গাইতো এই গানটা। ঐ বছর লতা মুঙ্গেসকরের 'ও প্রজাপতি, প্রজাপতি, পাখনা মেলো' গানটাও বেরিয়েছিল, এই গানটাও আমার ছোট ভাইটা সুন্দর করে গাইতো (আমাদের আর কিছুতো করার ছিলোনা)। কিনতু ৬ বছরের এক বালিকার হৃদয়ে 'গঙ্গা আমার মা' গানটাতে যে কি তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হতো, তখনই এই গানের কথাগুলো বুঝতে পারতাম, মায়ের কাছে জানতে চাইতাম, গানটা এমন কেন। আমার মায়ের তখন তরুণী বয়স, তার উপর স্বদেশী আন্দোলনের বই পড়ে পড়ে তাঁর চিন্তা ভাবনা গুলো অন্য সব মায়েদের থেকে ভিন্ন ছিল, নিজের ঘর-সংসার ফেলে এসে যাযাবরের জীবন যাপন, কাজেই তাঁর ব্যাখ্যাগুলো ছিল অনেক অন্য রকম। সেই থেকেই আমাদের শিশু হৃদয়ে দেশপ্রেম এর বীজ বোনা হয়ে গেছে, সেই থেকেই ভুপেন হাজারিকা আমার প্রিয় শিল্পী হয়ে গেছে। অনেকের মত আমরাও থেকে যেতে পারতাম ভারতেই, কারন আমাদের কিছুই অবশিষ্ট ছিলোনা দেশে, সাত মাসে আমার বাবা আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন, কাকার ওষুধের দোকানের ব্যবসা খুব সচল করে দিয়েছেন, কিনতু তারপরেও আমরা থাকিনি, আমাদের দেশপ্রেমিক বাবা মায়ের হাত ধরে দেশে চলে এসেছিলাম, আমার বাবা আবার শূণ্য থেকে শুরু করেছিলেন।.......Read More