Tuesday, December 13, 2011

মানবতাবাদী এক গানের মানুষ

By  সাকী আহ্সান ,source :  thedailysangbad.com

আসামে জন্ম নেয়া উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা মারা গেলেন গত ৫ নভেম্বর। অসমীয়া তার মাতৃভাষা হলেও বাংলায়ও তিনি প্রচুর গান করেছেন। এসব গানের বেশিরভাগই অসমীয়া গানের অনূদিত রূপ। বাংলা ভাষায় গান পরিবেশনেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। নিজের মুনশিয়ানার স্বাক্ষর রেখেই বাংলাভাষীদের কাছে তিনি প্রবাদতুল্য সংগীত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ভূপেন হাজারিকা একাধারে ছিলেন গায়ক, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, সাংবাদিক ও অভিনেতা। তবে তার সব পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে সংগীতশিল্পীর পরিচয়। গানের মানুষ হয়েই তার জন্ম।
মাত্র ১০ বছর বয়সেই যিনি গান লিখে সুর দিয়েছিলেন তাকে গানের মানুষই বলতে হবে। ১৯৩৯ সালে ১২ বছর বয়সে তিনি অসমীয়া ভাষায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্রে গান গেয়েছিলেন। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা পরিচালিত সেই চলচ্চিত্রের নাম ছিল ইন্দুমালতী। পরে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছিলেন। অসমীয়া চলচ্চিত্র পরিচালনায় তার বেশ সুখ্যাতিও জুটেছিল। তবে তার প্রকৃত সুখ্যাতি আসে গানে। আর এই সুখ্যাতির সীমানা আসাম ছাড়িয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে সে প্রান্তেই তার গান শুনতে পাওয়াই স্বাভাবিক।
ভূপেন হাজারিকা গান রচনা করেছেন, সুরও দিয়েছেন। তার গানের বাণী আর সুরে ছিল ভিন্ন ধরনের এক বলিষ্ঠতা। এজন্য অসমীয়া লোকসংগীতের কাছে তার ঋণ অনেক। ভূপেন হাজারিকার সংগীতের আগাপাশতলার চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণের ভার বিশেষজ্ঞদের। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা যেটুকু বুঝি সেটুকু হচ্ছে তার গান আমাদের হৃদয়ের তন্ত্রীকে ছুঁয়ে যায়। তার গানের বাণী আমাদের কানে বাজে বারবার। তার গায়কী, মন্দ্র স্বরের কণ্ঠ আর তার গানের বাণী মনের মধ্যে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তোলে। ভূপেন হাজারিকার মন্দ্র স্বরের টেস্ট আর কারও মধ্যে পাওয়া যায় না। তার গাওয়া গান অন্য কারও কণ্ঠে শুনে আরাম হয় না_ সাধারণ শ্রোতা হিসেবে এটুকুই বুঝি।
মানবতা, যেমন রাজনীতি আর মানবীয় সম্পর্ক ছিল তার গানের প্রধান বিষয়। মানুষ-সমাজ-রাজনীতির কথা বলেই তিনি শ্রোতাদের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তার গানে মানুষ-সমাজ-রাজনীতি উপস্থাপিত হয়েছে ঋজুভাবে। এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। শোষক-নিপীড়কের অত্যাচার-অন্যায়ে মানবতা হোঁচট খেয়েছে বারবার। ভূপেন হাজারিকা মানুষের শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের অবসান চেয়েছেন। তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন, মানবতাকে সবকিছুর ঊধর্ে্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন। মানবতার জন্য কখনো কোমল কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন মানুষকে, কখনো নিপীড়কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, কখনো করেছেন আর্ত-বিলাপ।
১৯২৬ সালে জন্মেই স্বদেশকে দেখেছেন ব্রিটিশ শাসন-শোষণের অধীন। তার যখন জন্ম হয় তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতের মুক্তির পথ আরও ২১ বছর। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে তরুণ ভূপেন আন্দোলন-সংগ্রাম হতে দেখেছেন। সেই আন্দোলন-সংগ্রামে তিনিও আন্দোলিত হয়েছিলেন। তার লেখাতেই এর প্রমাণ মিলবে_
'কতগুলো ঘটনা পরম্পরায় আমার মনের মধ্যে রিঅ্যাকশন চলেছে। গান্ধীজি বলেছেন, কুইট ইন্ডিয়া। নেতাজি বলছেন, অহিংসার পথে স্বাধীনতা আসবে না। আর মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্র বলছে, এটা নাকি পিপলস ওয়ার।'
স্বাধীনতা আন্দোলনে আন্দোলিত ভূপেন প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তারুণ্যে সংগীতের পাশাপশি মাটি ও মানুষের রাজনীতিও তার আরাধ্য ছিল। একদিকে গান শিখেছেন আরেক দিকে মার্কসবাদী দীক্ষা নিয়েছেন। বামপন্থি গণনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। ভারতে যখন গণনাট্য সংঘ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সংঘবদ্ধ করছে তখন তিনি গান লিখে-গেয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৩৯ সালের লিখেছেন_ অগি্নযুগের স্ফুলিঙ্গ আমি/নতুন ভারত গড়িব/সর্বহারাদের সব দিয়ে আজ/নতুন ভারত গড়িব... শোষিতের পক্ষের রাজনীতিই ছিল তার আরাধ্য।
নিপীড়িত-নির্যাতিত-বঞ্চিত মানুষ সবসময়ই তার গানের বিষয় হয়েছে। নিপীড়িত মানুষের আওয়াজে পরিণত হয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। অত্যাচারী-নিপীড়কের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি, যে কারণে স্বভাবসিদ্ধই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান গেয়েছেন_ জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ,/জয় জয় মুক্তিবাহিনী/ভারতীয় সৈন্যের সঙ্গে রচিলে/মৈত্রীর কাহিনী... তার গানে মুক্তিকামী বাঙালি সেদিন সাহস আর অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। আজও অনেকেই বলেন, তার গাওয়া 'হে দোলা হে দোলা', 'গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা', 'বিস্তীর্ণ দু'পারে' প্রভৃতি গান এদেশের মুক্তিকামী মানুষকে আন্দোলিত করেছিল। বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়ন তার মর্ম যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল। সে হিসেবে তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সারথি বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশ নিয়ে, বিশেষকরে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে তিনি ছিলেন উচ্ছ্বসিত, উচ্চকিত। বাংলা সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় তিনি কলকাতার চেয়ে ঢাকাকে এগিয়ে রেখেছিলেন অনেক আগেই। নিজের লেখাতেই তিনি বলেছেন_ একসময় বঙ্গ সংস্কৃতির জন্য সারাপৃথিবী যেমন কলকাতার দিকে তাকিয়ে থাকত, আজ ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে থাকে ঢাকার দিকে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলা সংস্কৃতির গভীরতা কলকাতার চেয়ে ঢাকায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের মানুষ-ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি তার আত্মার টানটা টের পাওয়া যায় বেশ।
শুধু আসাম বা বাংলাদেশের মানুষ নয়, সারাজগতের মানুষের প্রতিই তার ছিল অসীম মমত্ব। তিনি গেয়েছেন_ মানুষ মানুষের জন্য/জীবন জীবনের জন্য/একটু সহানুভূতি কি/মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু...। তার গানের এই মানুষ যে কেবল আসামের মানুষ নয়, তা কারও বলে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি মানুষের এই বিস্তৃত রূপের সন্ধান পেয়েছিলেন বেনারসে। তার লেখাতেই রয়েছে:
বেনারসে আসার পর আমার জীবনের চিন্তাধারাটাই বদলে গিয়েছিল। একসময় মারাঠি বা গুজরাটি বা অন্য প্রদেশের মানুষকে দেখলে মনে হতো যেন কত আপনার। আবার যখন আমার সহপাঠী হিসেবে একজন আফ্রিকার ছেলে, একজন ইন্দোনেশিয়ার ছেলে বা একজন জাপানের ছেলেকে দেখতাম কিংবা একজন মুসলমান সহপাঠীকে সংস্কৃত পড়তে দেখতাম তখনই বিশ্বমানবতার প্রকৃত স্বরূপ ক্রমে পরিষ্কার হয়ে যেত। চোখের সামনে দেখেছি, কাশ্মীরের অধিবাসী আহমেদ হাসান দানি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিরেক্টর অফ আর্কিওলজি হয়েছেন। কলকাতায় থাকলে আমি পূর্ব ভারতীয়ই হয়ে থাকতাম। কিন্তু বেনারসে গিয়ে আমি মহাভারতের সন্ধান পেয়েছিলাম।
সারাজীবন বামপন্থিদের ঘনিষ্ট বলে পরিচিত হয়ে এলেও তিনি বিস্ময়করভাবে ২০০৪ সালে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হয়ে লোকসভা নির্বাচন করেন। তার আকস্মিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে সেদিন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন, মর্মাহত হয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যেতেই পারে। কিন্তু সারাজীবন মানবতা-অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান গাওয়া ভূপেন অ্যাবাউট টার্ন করে হিন্দুত্ববাদী দলে যোগ দেবেন, এমনটা বোধহয় কেউ মানতে পারেনি। সাধারণ মানুষও তার বিজেপি'র প্লাটফর্মকে পছন্দ করেনি। নির্বাচনী ফলাফলেই মানুষের হতাশাটা বোঝা যায়। লোকসভা নির্বাচনে তিনি জিততে তো পারেনইনি, জয়ের কাছাকাছিও ছিলেন না। নির্বাচনে তার স্থান ছিল তৃতীয়। অথচ এই ভূপেনই ১৯৬২-৭২ সালে আসাম বিধানসভার নির্দলীয় সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বেশি দিন ছিলেন না বিজেপির সঙ্গে। বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া ত্যাগ করলেও তার সেই অবস্থান আজও মানুষকে ভাবায়।
রাজনৈতিক বিতর্কে ভূপেনের সারাজীবনের কৃতিত্ব মস্নান হওয়ার নয়। তার মৃত্যুতে অসমীয়াদের পাশাপাশি বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষীদের শোক, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে লাখো জনতার শ্রদ্ধা দেখে এমন প্রতীতিই জন্মে আমাদের। ভূপেন হাজারিকার শেষকৃত্য শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে যখন আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা (পরেশ) অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে, তখন বোঝা যায় প্রকৃতই তার মতো মহান শিল্পীদের ভালোবাসা পাওয়ার কোন সীমা নেই। অনেক সম্মান আর স্বীকৃতিই তিনি পেয়েছেন জীবনে_ পদ্মশ্রী (১৯৭৭), দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২), পদ্মভূষণ (২০০১), অসম রত্ন (২০০৯) প্রভৃতি। কিন্তু দেশ-কালের গ-ি পেরোনো গণমানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর স্মরণে তিনি যে অনন্য স্থান অর্জন করেছেন, ভূপেন হাজারিকার মতো মানবতাবাদী শিল্পীর জন্য তার চেয়ে বড় অর্জন আর কিছুই হতে পারে না।
বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঠিকই বলেছেন, 'ভূপেনের কোন সীমারেখা নেই। সে আজ শুধু বাংলা বা শুধু আসামের, এমনকি সারাভারতবর্ষেরও নন_ সারাবিশ্বের। তার সৃষ্টি তাকে অমর করে রাখবে। মানবতাবাদী একজন মহান শিল্প প্রস্থান করেছেন পৃথিবী থেকে। তবে যাওয়ার সময় তার মানবতার বাণী আর সুর রেখে গেছেন মানুষের মাঝে। এই বাণী আর সুরের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকুন।