Wednesday, December 21, 2011

মুক্তিযুদ্ধে ভূপেন হাজারিকার ভূমিকা

 ড. আবুল আজাদ , dailyjanakantha.com , 13 Dec 2011
ত ৫ নবেম্বর ২০১১ শনিবার প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা জগত সংসারের সকল মায়ার বন্ধন ত্যাগ করলে ভারতের মতো বাংলাদেশের মানুষও শোকাভিভূত হয়ে পড়ে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সময় ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। গত ২৯ জুন শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে তাঁকে ভারতের মুম্বাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দফা চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি ঘটলে আই.সি.ইউতে রাখা হয়। কিডনি দুটি ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁকে ডায়ালিসিস করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল, শেষ রক্ষা হয়নি।
কিংবদন্তির এই শিল্পী মৃত্যুর আগে কয়েক দশকব্যাপী গণমানুষের গান গেয়ে ভারত, বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল বাঙালী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার "গঙ্গা আমার মা,পদ্মা আমার মা" ভারত-বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও তার "মানুষ মানুষের জন্য," "বিসত্মীর্ণ দু'পাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে," "আমি এক যাযাবর" বিশ্বের ত্রিশ কোটি বাঙালীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান লাভ করেছে। এই মহান সঙ্গীতশিল্পী ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের অসম রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। অসমিয়া তাঁর মাতৃভাষা হলেও তিনি বাংলা, হিন্দী এবং অসমিয়া আঞ্চলিক ভাষায় গান করেন। তাঁর প্রায় সব গানই গণচেতনতামূলক যা তাঁকে ভারতীয় উপ-মহাদেশে স্বতন্ত্র ধারার সঙ্গীত স্রষ্টার আসনে ঠাঁই দিয়েছে। সঙ্গীত সাধনার জন্য তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 'পদ্মশ্রী' ও 'পদ্মভূষণ' পদকসহ জীবদ্দশাতেই অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭১ সালে শিল্পী ভূপেন হাজারিকা ছিলেন অসম বিধান সভার সদস্য এবং জননন্দিত রাজনীতিক। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের অপারেশন সার্চলাইটের মধ্যেমে ব্যাপক গণহত্যা শুরু হলে পাক হায়নাদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে মানুষ ঢাকা ছাড়তে থাকে। পরবর্তী তিন দিনের মধ্যেই সারাদেশে গণহত্যা শুরু হলে মানুষ জীবন বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এ সময় অবরম্নদ্ধ থাকায় পরিস্থিতির বাসত্মবচিত্র প্রকাশ না পেলেও বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের স্থানীয় সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন আনত্মর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিস্থিতির কিছু কিছু চিত্র প্রকাশ পাচ্ছিল এবং বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা ভারতের প্রাদেশিক বিধান সভাসমূহের জরুরী সভা আহ্বান করে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আমার "মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা সংবাদপত্রের ভূমিকা" (প্রকাশকাল ২১ ফেব্রম্নয়ারি ২০০৪) গ্রন্থের ৪০ পৃষ্ঠায় ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ৩১ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যার তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত " অসম বিধান সভায় বাংলা সরকারকে স্বীকৃতি দানের দাবি প্রস্তাব" শীর্ষক উদ্ধৃত সংবাদে মন্তব্য করা হয়, "গুয়াহাটি ৩০ মার্চ : আজ অসম বিধান সভায় সর্বসম্মত প্রস্তাবে অবিলম্বে স্বাধীন বাংলা সরকারকে স্বীকৃতি ও সর্বপ্রকার সাহায্য দানের জন্য ভারত সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। আজ বিধান সভা অধিবেশন চলাকালে সদস্য ড. ভূপেন হাজারিকা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলে সমসত্ম সদস্য পতাকাকে অভিনন্দন জানান।"
এবার আমি একটু পেছনে ফিরে যাই, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পি-এইচ.ডি করতে গিয়ে সেখানে আমার অবস্থানের মেয়াদ ছিল সব মিলিয়ে প্রায় ছয় বছর। এ সময় আমি পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রদেশে সফর করার বিরল সুযোগ পাই। আমার গবেষণার বিষয় ছিল 'জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা।' তবে যেখানেই গেছি গবেষণা সংক্রানত্ম তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আমি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভারতীয়দের তীব্র ক্ষোভ এবং উষ্মা লক্ষ্য করি। সব জায়গাতেই একই সুর, কণ্ঠ- "সেই যে ৭১-এ গেলেন আর তো একদিনও দেখতে এলেন না। আমরা তো আপনাদের যত্নআত্তির ত্রম্নটি করিনি।" বিষয়টি আমার ভেতর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আমি তখন কলকাতায় শ্রী অন্নদাশংকর রায়, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী-পুলিশ মন্ত্রী ও পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষসহ ঢাকায় কথাশিল্পী শওকত ওসমান, নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান সহ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধানত্ম নেই যে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ১৯৯৭ সালের ২-৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। ঐ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯ জন বিশিষ্ট ভারতীয় নাগরিককে সংবর্ধনা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাদের মধ্যে ড. ভূপেন হাজারিকা অন্যতম। আমরা সংবর্ধনার জন্য নির্বাচিত প্রত্যেকের পূর্ব সম্মতি গ্রহণ করি। এ উদ্দেশ্যে কলকাতার যাদবপুর সংলগ্ন গলফ গ্রীনের ৭৭/বি, গলফ ক্লাব রোডের ভূপেন হাজারিকার বাসায় যোগাযোগ করি। আমাকে জানানো হয় উনি বোম্বেতে থাকেন মাঝে মধ্যে কলকাতায় আসেন। আমি বোম্বের নম্বর নিয়ে টেলিফোনে কথা বললে তিনি দিন পনেরো পরে কলকাতায় আসবেন বলে জানান। কিন্তু তিনি আর আসেননি। আমি বোম্বেতে যোগাযোগ করলে তিনি জানান একটি ছবি নির্মাণ নিয়ে অনেক ঝামেলার মধ্যে আছেন এবং উৎসবের জন্য নির্ধারিত সময়ে তার পক্ষে কলকাতায় আসা সম্ভব নয়। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সংবর্ধিতদের তালিকায় তখন সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে আমাদের প্রত্যাশা হয়ে রইলেন শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস।
যথারীতি মুক্তিযুদ্ধ উৎসব হয়ে যাওয়ার পর কলকাতা থেকে ফেরার আগে আমি পুনরায় যোগাযোগ করি ভূপেন হাজারিকার কলকাতার বাসায়। তাঁর সহকারী জানান, উনি এখন গুয়াহাটি আছেন, কালই কলকাতা ফিরছেন। পরদিন বিকেলে আবার ফোন করি। শিল্পী ভূপেন হাজারিকা আমাকে বললেন, তোমার উৎসব তো শেষ। আমি বোম্বেতে দূরদর্শনে অনুষ্ঠান দেখেছি, আর কি বাকি রইল বল? আমি বললাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আপনার অসামান্য অবদানের কিছু কথা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই। আমি এ বিষয়ে গবেষণা করছি। তিনি বললেন, কাল সারাদিন রেকর্ডিংয়ে ব্যসত্ম থাকব। পরশু সকালের ফ্লাইটে বোম্বে ফিরছি। সময় থাকলে তুমি এখনই চলে আস। আমি ছুটে যাই তার গলফ ক্লাব রোডের ৭৭/বি নম্বর বাসায়। গিয়ে দেখি অগণিত দর্শনার্থী। সবাইকে ডিঙ্গিয়ে তাঁর চেয়ারের পাশে গিয়ে আমার পরিচয় দিই। উনি জানতে চান তোমার কতক্ষণ সময় লাগবে। আমি বললাম সেটা তো নির্ভর করছে আপনার ওপর, আপনি কতক্ষণ বলবেন। তিনি দর্শনার্থীদের আধাঘণ্টা বসার অনুরোধ করে, আমাকে ভেতরের একটি রম্নমে নিয়ে বসালেন। জিজ্ঞেস করলেন-বল কি জানতে চাও? আমি বললাম '৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আপনার ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলুন যা আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন এত দিন পরে কেন? আমি বললাল ভাল কাজটা সব সময় বিলম্বেই হয়, যেমন-"ওয়ার এ্যান্ড পিস" ফ্রেঞ্চ যুদ্ধের পঁয়ষট্টি বছর পর তলসত্ময় লিখেছেন।
-"তোমাদের যুদ্ধের কত বছর পর সেই ইতিহাসটা লেখা হবে?"
-আমাদের অনেকেই লিখছেন, এদের মধ্যে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই সফল হবেন। আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আপনার ভূমিকা জানতে এসেছি।
-"১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে পশ্চিম পাকিসত্মানী সৈন্যরা পূর্ব পাকিসত্মানে যে গণহত্যা, নির্যাতন, লুটপাট শুরম্ন করে তার বিসত্মারিত জেনে আমি খুব মর্মাহত হই। ভারতে বসবাসকারী বাঙালীসহ সমগ্র ভারতবাসী ঐ রকম একটি আকস্মিক ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। আমি তখন গুয়াহাটিতে ক'জন বিধায়কের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। সম্ভবত ৩০ মার্চ বিধান সভার অধিবেশনে আমি তোমাদের জাতীয় সঙ্গীত রবিঠাকুরের "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি" গাইতে গাইতে তোমাদের জাতীয় পতাকা নিয়ে বিধান সভায় প্রবেশ করি। কিছু সদস্য আমার এই ভূমিকাকে সহজভাবে না নিলেও সেদিন অধিকাংশ বিধায়কই আমাকে সমর্থন জ্ঞাপন করেন এবং বিধান সভার অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে আমি আমার বক্তব্য পেশ করি। তখন সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে স্বীকৃতি প্রদান এবং শরণার্থীদের আশ্রয়দানের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানানোর প্রসত্মাব গৃহীত হয়। আমি যখন বিধান সভায় বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শন করি এবং দাঁড়িয়ে আমার সোনার বাংলা গাইতে থাকি তখন বিধান সভার স্পীকারসহ সকল বিধায়ক দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন করেন। তুমি এ সময়ের বিভিন্ন পত্রিকায় এই ঘটনার তথ্যগুলো পাবে।"
এবার সামনে ফিরে যাই। কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আমি কিছুটা সময় প্রস্তুতি নিয়ে প্রথমে ত্রিপুরায় যাই তারপর মেঘালয় এবং অসমের গুয়াহাটি। তন্নতন্ন করে খুঁজে ফিরি '৭১-এর মার্চের সে সময়ের পত্রিকা। কিন্তু কোথাও কোন পত্রিকারই কপি মেলে না। শেষতক ফিরতি পথে আমাকে উদ্ধার করেন ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক পারমিতা লিভিংস্টোন। এই পত্রিকাটি '৭১ সালেও বেরম্নত, এখনও অব্যাহত আছে অথচ পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার ঐ সময়ে প্রকাশিত অনেক পত্রিকা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পারমিতা '৭১-এর ফাইল খুললেন এবং ৩১ মার্চ সংখ্যায় পেয়ে গেলাম সেই প্রত্যাশিত সংবাদটি, যদিও অতিমাত্রায় সংক্ষিপ্ত-বিষয়টি ইতোমধ্যেই উলেস্নখ করা হয়েছে। এখন বিরল ভূমিকা যার_আমাদের মুক্তি সংগ্রামে, তার মৃতু্য সংবাদে এই তথ্য উলেস্নখ না করে আমরা তাঁর শেষ যাত্রায় সম্মান প্রদর্শনে কার্পণ্য করে ফেললাম। এ জন্য ড. ভূপেন হাজারিকার বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাই। পত্রিকায় দেখলাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবার বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বিদেশীদের সম্মাননা প্রদান করা হবে। সরকারের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, ঐ তালিকার মরণোত্তর অংশে যাতে ড. ভূপেন হাজারিকার নাম থাকে।
লেখক : গবেষক