Tuesday, December 4, 2012

ভূপেন হাজারিকা: মানুষের জন্যে নিবেদিত এক শিল্পী

By অলভী সরকার , shyamolbangla.com
যেন চোখের নিমেষে পার হয়ে গেল ৩৬৫ দিন। চোখ বন্ধ না করেও অনুভব করতে পারি সে দিনটির কথা, যেদিন মারা গেলেন ভূপেন হাজারিকা। কেননা, এই ্অনুভূতির উৎস প্রোথিত ছিল আরও গভীরে। দূরদর্শনে সংবাদটি জানার সাথে সাথে স্মৃতিকাতর হয়েছিলাম সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ একটি দিনের কথা ভেবে। এক বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে ওঠা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগের সাথে শুনেছিলাম, ‘একখানা মেঘ ভেসে এল আকাশে/এক ঝাঁক বুনো হাঁস পথ হারালো/একা একা বসে আছি জানালা পাশে…।’ বৃষ্টির সাথে প্রেমের বেদনাকে মিলিয়ে গাওয়া সেই অপূর্ব সুষমামণ্ডিত গানের গায়ককে আরও সরল গাম্ভীর্যের সাথে অনুভব করি তাঁর সৃষ্টির প্রাণপ্রাচুর্য দেখে। অভিভূত হই, ব্যক্তিপ্রেমের আগল ভেঙে বাণী ও সুরের মূর্ছনা যখন ছড়িয়ে পড়ে সমষ্টির প্রতি।
কিংবদন্তিতুল্য গায়ক ও সঙ্গীতনির্মাতা ভূপেন হাজারিকা ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নীলকান্ত হাজারিকা এবং মা শান্তিপ্রিয়া হাজারিকার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। ১৯৪০ সালে তেজপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বি.এ. এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ. পাশ করেন। ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’তে অল্প কিছুদিন কর্মরত থাকার পর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি বৃত্তি পান এবং ১৯৪৯ সালে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৯৫২ সালে তিনি পিএইচ. ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। নিউইয়র্কে থাকা অবস্থায় ১৯৫০ সালে  প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন এবং ১৯৫৩ সালে স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রসন্তানসহ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৩ বছর বয়সেই মূর্ত হয়ে ওঠে তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভাÑ যখন তিনি নিজেই গান লিখে সুরারোপ করেন। শিশু কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন অসমীয়া চলচ্চিত্রে। পরবর্তীকালে তিনি নিজেই অসমীয়া চলচ্চিত্রের একজন গুণী পরিচালক হয়ে ওঠেন। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর চলচ্চিত্র। তবে মানুষকে তিনি সর্বাাধিক আলোড়িত করেছেন তাঁর সঙ্গীত দিয়ে। অন্যান্য পরিচয়কে অতিক্রম করে একজন সঙ্গীতস্রষ্টা হিসেবে তিনি নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন মানুষের মনে। তাঁর গানে প্রশ্ন-উত্তর-দ্বিধা-যুক্তির ছন্দে ছন্দে মানুষের কথাই ধ্বনিত হয়েছে বারবার।
‘গান’-এর সংজ্ঞায়ন তিনি নিজেই করেছেন এভাবেÑ ‘গান হোক বহু আস্থাহীনতার বিপরীতে এক গভীর আস্থার গান/এই গান হোক কল্পনাবিলাসের বিপরীতে এক সত্য প্রশস্তির জ্ঞান।’ এই সংজ্ঞায়নের ফলে গান আর নেহায়েত কোনো বিমূর্ত সত্তা হয়ে থাকে নি; সে যেন মানুষের কথা বলতে মানুষের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আর ভূপেন হাজারিকাও আজীবন এই  মর্যাদায় তাঁর গানকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন।
অসমীয়া লোকসঙ্গীতে আধুনিক তুলির আঁচড় দিয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে এসব গান। নিউইয়র্কে থাকা অবস্থায় তাঁকে প্রভাবিত করেন বন্ধুস্থানীয় পল রুবিসন; পরবর্তীকালে তিনি জন্ম দেন আশ্চর্য সুন্দর সেই গানÑ ‘বিস্তীর্ণ দুপারে, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও/নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি, গঙ্গা বইছো কেন’। হিন্দী এবং বাংলায় এমন অনেক অনূদিত ও মৌলিক গানের সুর ও বাণীস্রষ্টা তিনি নিজেই। ‘তুমি-আমি’র একচ্ছত্র সত্যকে অতিক্রম করে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন বহুমানুষের সত্যকে। তাঁর কণ্ঠে প্রেমের গানও তাই উচ্চরিত হয়েছে উদাত্ত সুরে। প্রেমিকাকে নিয়ে তিনি আড়ালের নীড় বাঁধার স্বপ্ন দেখেন নি; বরং দয়িতাকে আহবান জানিয়েছেন রাজপথেÑ ‘‘আমি ভালোবাসি মানুষকে/ তুমি ভালোবাসো আমাকে/ আমাদের দুজনের সব ভালোবাসা আজ/ এসো বিলিয়ে দিই এই দেশটাকে।’’ পরস্পর নতুন জীবনের সন্ধান পেতে চেয়েছেন সহস্র প্রাণের স্বপ্নমিছিলেÑ ‘‘মিলেমিশে যাই এসো জনতার এই মহারণ্যে’’।
ব্রিটিশ শাসনের কষাঘাতে পর্যুদস্ত দেশ ও মানুষ, স্বাধীনতালাভের পর একটু একটু করে এগিয়ে যেতে চেয়েছে আরোগ্যের পথে; তার সাথে সঙ্গী হয়েছেন ভূপেন হাজারিকা; সঙ্গীতের বিপ্লবী ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন মানুষের সত্তায়; আত্মচেতনায় তাড়িত হয়ে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন সত্য-সুন্দরের বাণী দিয়ে। আপাতভাবে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও স্বাধীন ভারতবর্ষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গিয়েছিলো শোষণের বীজÑ ‘‘আঁকাবাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই রাজা-মহারাজাদের দোলা/ আমাদের জীবনের, ঘামে ভেজা শরীরের বিনিময়ে পথ চলে দোলা’’।
এরই সমান্তরালে তিনি শোষিতের চিত্র এঁকেছেন; তুলে ধরেছেন শোষণ-বঞ্চনার করুণ চিত্রÑ ‘হায় মোর ছেলেটি উলঙ্গ শরীরে/ একটু জামা নেই খোলা’। কেবল শাসনযন্ত্রের সঙ্গে জনমানুষের দ্বন্দ্ব নয়, সমাজের সব রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমান সোচ্চার ছিলেন তিনি। প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সবাই যখন রোমান্টিকতায় মগ্ন, তিনি তখন আত্মদৈন্যে ভুগেছেন সাধারণ মানুষের পাশে না দাঁড়াতে পারার কষ্টেÑ ‘শিশিরে ভেজানো রাতে/বস্ত্রহীন কোনো ক্ষেতমজুরের/ভেঙে পড়া কুটিরের ধিকিধিকি জ্বলে থাকা/তুষে ঢাকা আগুনের রক্তিম যেন এক উত্তাপ হই’। বর্ণবাদের প্রতি কটাক্ষ করে গেয়েছেনÑ ‘আমায় একজন সাদা মানুষ দাও, যার রক্ত সাদা/ আমায় একজন কালো মানুষ দাও, যার রক্ত কালো/ যদি দিতে পারো, প্রতিদান যা কিছু চাও হোক অমূল্য, পেতেই পারো’’। চা পাতার রূপক নির্মাণ করে তিনি এঁকেছেন শোষিতের কষ্টÑ ‘এই মানুষরূপী পাতার সাধ/পিশাচেরা বাড়ায় হাত/অকালে হায় ছিনিয়ে নিতে আসে দলে দলে…’।
অসাম্প্রদায়িকতা আর সাম্য তাঁর সঙ্গীতের মূলমন্ত্রÑ ‘সংখ্যালঘু কোনো সম্প্রদায়ের ভয়ার্ত মানুষের না ফোটা আর্তনাদ, যখন গুমরে কাঁদে/আমি যেন তার নিরাপত্তা হই’। কেবল সংকট উপস্থাপন করে ক্ষান্ত হন নি; নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর সত্যিকার আকাক্সক্ষা অনুভব করেছেন তিনি। ভূগোল-ইতিহাস-পুরাণকে সামনে রেখে তিনি মানবিকতার জয়গান গেয়েছেনÑ ‘একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না…’। হৃদয়ের প্রখর তীব্রতা ছাড়া এমন তেজোদ্দীপ্ত বাণী উচ্চারণ সম্ভব নয়।
‘মানুষ মানুষের জন্য/জীবন জীবনের জন্য’ গেয়ে ওঠার তাড়না ভূপেন হাজারিকা পেয়েছেন নিজেরই অন্তর্লীন প্রশ্নমালা থেকে, যখন জীবন সম্পর্কে তাঁর মনে বেজে  ওঠেÑ ‘এক বাঁও মেলে না/দো বাঁও মেলে না/ জীবন জাহাজ আওয়াজ তোলে শোন শোন/প্রাণসায়রে তোলে কত আলোড়ন’’। এই অস্থিরতাই সত্যিকারের শিল্পীর সঞ্জীবনী শক্তি; এই তরঙ্গ তাঁর সৃজনগতির সঞ্চালক। বহু পুরস্কার ও সম্মাননাপ্রাপ্ত এই মহান শিল্পী রেখে গিয়েছেন মানুষকে উজ্জীবিত করার মতো অজস্র সৃষ্টিকর্ম। তাঁর শরীরী অস্তিত্বটা আজ আর নেই; ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর দেহত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের প্রতিটি শব্দ, তাঁর বক্তব্যের প্রতিটি উচ্চারণ মানুষকে বারবার দাঁড় করায় মানবিক বোধের সামনে। ব্যক্তি ও সমষ্টির সেই সমস্ত সুকুমার বোধ যুগ যুগ ধরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি রেখে যাবে।