Thursday, September 8, 2016

ভূপেন হাজারিকা-কল্পনা লাজমি: চিরদিনের সঙ্গী

দুজনের বয়সের ব্যবধানও ছিল অনেক। ১৯৭১ সালে দুজনের প্রথম দেখা হয়। ১৭ বছর বয়সী কল্পনা লাজমী তখন সেন্টজেভিয়ার্স কলেজের মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন। ভূপেন হাজারিকার বয়স তখন ৪৫ বছর।

ভূপেন তখন লাজমির কাকা আত্মারামের একটি ছবিতে সংগীত পরিচালনার কাজ করছিলেন। সেসময়ই তিনি দারুণ জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত গায়ক এবং সংগীতজগতের কিংবদন্তিরূপে স্বীকৃত।
ভূপেন হাজারিকার জন্ম আসামের সাদিয়াতে ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই আসামের লোকজ গানের জগতে তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। লেখাপড়া করেছেন আসামের সোনারাম, তেজপুর, ধুবড়ি এবং বানারস বিশ্ববিদ্যালয়ে।
স্কুলজীবন থেকেই গান করেছেন মঞ্চে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন তরুণ বয়স থেকেই।১৯৪৯ সালে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে পিএইচডি করেন।
সেখানে প্রখ্যাত লেখক পল রবসনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পল রবসনের মানবতামুখী চিন্তায় প্রভাবিত হন ভূপেন হাজারিকা। তার লেখা গানে ফুটে ওঠে মানবতার কথা।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় গবেষক প্রিয়ংবদা প্যাটেলের। ১৯৫০ সালে তারা বিয়ে করেন। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান তেজ হাজারিকা।
১৯৫৩ সালে ভূপেন হাজারিকা ভারতে ফিরে আসেন। প্রিয়ংবদার সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি কখনও। কিন্তু তারা পৃথক বসবাস করতেন। তাদের মানসিক দূরত্বও ছিল বিশাল। প্রিয়ংবদা যুক্তরাষ্ট্রেই থেকেছেন আজীবন।
দেশে ফিরে ভূপেন হাজারিকা গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন শিক্ষকতা করেন। পরে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। পাশাপাশি আইপিটিএ-র(ভারতীয় গণনাট্য সংঘ) সক্রিয়কর্মী ও নেতা হিসেবে গণনাট্যের কাজ চালিয়ে যান।
এই সময়ই তিনি মূলত গণমুখী সংগীত রচনা করেন এবং গান গেয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পান। চলচ্চিত্রেও তিনি সাফল্য পান বটে, কিন্তু গণমুখী গানই তাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
কল্পনা লাজমি এ‌সেছিলেন এক অগ্রসর পরিবার থেকে। মামা গুরু দত্ত ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। মা ললিতা লাজমি ছিলেন শিল্পী। পুরো পরিবারই সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল।
কিশোর বয়স থেকেই কল্পনা লাজমি ভক্ত ছিলেন ভূপেন হাজারিকার। এই জীবন্ত কিংবদন্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি তার প্রেমে না পড়ে থাকতে পারেননি। তিনি শুধু প্রেমিকা হয়েই থেমে থাকেননি। তিনি তার সহকারী ও ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
ব্যক্তি জীবনে ভূপেন হাজারিকা ছিলেন নিঃসঙ্গ; ভীষণভাবে অগোছালো, বেহিসাবী এবং খেয়ালি ধরনের। এই অগোছালো প্রতিভাবান মানুষটির জীবনে রীতিমতো আশীর্বাদ হয়ে আসেন তরুণী কল্পনা। ১৯৭৬ সালের দিকে কল্পনা সরাসরি ভূপেনের ফ্ল্যাটে চলে যান এবং একত্রে বাস করতে থাকেন।
তাদের পরিবার যথেষ্ট অগ্রসর হলেও এই সম্পর্ক মেনে নেওয়া কল্পনার বাবা-মায়ের জন্য বেশ কষ্টকর ছিল।তারা ভেবেছিলেন, এই প্রেম বেশিদিন টিকবে না, মোহভঙ্গ হবে তাদের মেয়ের। কিন্তু কল্পনা কোনো বাধাই মানেননি।
সেসময় কলকাতায় ভূপেনের ফ্ল্যাটে তাদের সংসার গড়ে ওঠে।
ভূপেন হাজারিকা বিয়ে করতে ভয় পেতেন। প্রথম দাম্পত্যের স্মৃতি তার পক্ষে ভালো ছিল না। তিনি মদ্যপান করতেন প্রচুর।
কল্পনা প্রথমদিকে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এই প্রেমিককে সামলাতে। তবে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া গড়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন কল্পনা লাজমি। ১৯৮৬ সালে কল্পনা চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাত দেন। তার প্রথম ছবি‘একপল’ গড়ে ওঠে আসামের চাবা গানের পটভূমিতে মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা গল্প অবলম্বনে। শাবানা আজমী, ফারুক শেখ ও নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত ছবিটির সংগীত পরিচালনার ভার নেন ভূপেন হাজারিকা। ছবিটি ব্যাপক প্রশংসা পায়।
সম্পর্কের প্রথমদিকে প্রায় বছর দশেক জনসমক্ষে বা কোনো অনুষ্ঠানে, পার্টিতে ভূপেন তার প্রেমিকাকে ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় করাতেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তাকে সঙ্গী হিসেবে পরিচয় করাতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে কল্পনা লাজমির অন্যান্য ছবিতেও সংগীত পরিচালনার কাজ করেন ভূপেন হাজারিকা। লাজমি পরিচালিত ‘রুদালি’ ছবির সংগীতের কাজ ছিল অসাধারণ।
আসামের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ভুপেন হাজারিকা ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি এবং বিশ্বনাগরিক। তার মৃত্যুর পর একাধিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে কল্পনা লাজমি তার প্রেমিকের বাঙালিত্ব এবং বিশ্বনাগরিকত্বের দিকটি তুলে ধরেছেন।
ভূপেন ভালোবাসতেন বাঙালি রান্না। সর্ষে ভাপা চিংড়ি ও কষানো মাংস তার প্রিয় খাবার ছিল। কল্পনাও তার জন্য বাঙালি খাবার রাঁধতে ভালোবাসতেন। সন্ধ্যাবেলাগুলো তারা কাটাতেন সংগীত ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে।
হাজারিকার নারীভক্তের অভাব ছিল না। তিনি নারীদের সঙ্গও বেশ পছন্দ করতেন। তবে তিনি ছিলেন লাজমির প্রতি বিশ্বস্ত।
১৯৯৬ সালে তারা মুম্বাইতে কল্পনা লাজমির ফ্ল্যাটে চলে আসেন। আজীবন বামপন্থি ভূপেন যখন হঠাৎ করে বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করেন এবং পরাজিত হন সেসময় অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেননি। তারা কল্পনা লাজমিকে এজন্য দায়ী করেন। কিন্তু কল্পনার মতে, এটি ছিল ভূপেনের তাৎক্ষণিক আবেগগত সিদ্ধান্ত।মূলত, কংগ্রেসবিরোধিতা থেকেই এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকেই ভূপেন হাজারিকা অসুখে ভুগতে থাকেন। লাজমি সেসময় অসুস্থ সঙ্গীর সেবাকাজ করতে গিয়ে নিজের ব্যস্ততা কমিয়ে দেন। ভূপেন সেসময় তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লাজমি রাজি হননি। তিনি বলেন, “এত বছর পর আর বিয়ে করা বা না করায় কিছুই আসে যায় না। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা বিয়ে করা বা না করার উপর নির্ভর করে না।”
২০১১ সালের ৫ নভেম্বর ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় ভূপেন হাজারিকার। তিনি দাদা সাহেব ফালকে, পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন।
এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে কল্পনা লাজমি শোকে ভেঙে পড়েন। তার জন্য এই মৃত্যু ছিল মর্মান্তিক।
এক সাক্ষাৎকারে কল্পনা বলেন, “চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষটি ধীরে ধীরে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য সহ্য করা যায় না। তার মৃত্যু মেনে নিতে মনের সঙ্গে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।”
কল্পনা লাজমি ও ভূপেন হাজারিকা ছিলেন পরস্পরের ভালোবাসায় ৩৯ বছর ধরে ডুবে থাকা দু’জন মানুষ। আর কল্পনা লাজমির কাছে তার ভালোবাসার মানুষটি চিরদিন বেঁচে থাকবেন স্মৃতি ও সংগীতের মাঝে।